কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের দীর্ঘদিনের কান্ডারি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে বাজিতপুর ও নিকলী বিএনপির রাজনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছে। নেতার প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং দলের 'অন্যায্য' সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত দুই দিনে কয়েকশ নেতাকর্মী স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।নেতাকর্মীদের ক্ষোভের মূলে 'নব্য বনাম ত্যাগী':পদত্যাগকারী নেতাকর্মীদের প্রধান অভিযোগ—যিনি ২৫ বছর ধরে এই জনপদের নেতাকর্মীদের জেল-জুলুম ও মামলা-হামলায় পাশে ছিলেন, সেই ত্যাগী নেতা শেখ মজিবুর রহমান ইকবালকে সরিয়ে মাত্র ২৫ দিন আগে দলে আসা এক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। একে 'নব্য বনাম ত্যাগী' সংঘাত হিসেবে দেখছেন মাঠের কর্মীরা।যাঁরা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন:মুহাম্মদ ওয়াসিমুল হক ওয়াসিম (সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, বাজিতপুর উপজেলা যুবদল): ৩০ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও ১৬টি মামলার আসামি এই নেতা পদত্যাগকালে বলেন, "আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেল খাটাকালীন আমার পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন ইকবাল ভাই। হাইকোর্ট থেকে ৫টি মামলা জামিন করিয়ে দিয়েছেন তিনি। অথচ উনাকে প্রথমে নমিনেশন দিয়েও পরবর্তীতে অন্য দল থেকে আসা ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আমি এই সিদ্ধান্ত ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে পদত্যাগ করলাম।"মোঃ সাগর মিয়া (যুগ্ম আহ্বায়ক, গাজীরচর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দল): বিগত সরকারের আমলে মামলার আসামি হওয়া এই নেতা জানান, "বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে ইকবাল ভাইয়ের নেতৃত্বে দল করেছি। নেতার সম্মানে আজ পদত্যাগ করলাম।"জাফর আহাম্মদ (গাজিরচর যুবদল): পদত্যাগ পত্রে তিনি লিখেছেন, "আমি ইকবাল ভাইয়ের লোক, আমার মার্কা হাঁস।"আলী আকরাম (সিনি: যুগ্ম আহ্বায়ক, গুরই ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জেলা মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম দল): তিনি ইকবাল সাহেবকে বিজয়ী করার শপথ নিয়ে পদত্যাগ করেছেন।আব্দুল নাসের শাওন (সদস্য, বাজিতপুর উপজেলা যুবদল): তিনি অভিযোগ করেন, ২৫ বছরের ত্যাগী নেতাকে বহিষ্কার করে ২৫ দিনের নব্য ব্যক্তিকে জায়গা দেওয়ার প্রতিবাদে তিনি দল ছাড়লেন।রোমানুর রহমান রোমান (সদস্য, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দল): ২১ বছরের রাজনীতি ও ৩৬ দিন জেল খাটা এই ত্যাগী নেতা বলেন, "দল ২৫ বছরের পুরস্কার হিসেবে বহিষ্কার উপহার দিয়েছে, তাই বিবেকের তাড়নায় বিদায় নিলাম।"অন্তর ইসলাম বাবু (আহ্বায়ক, বাজিতপুর উপজেলা জিয়া সাইবার ফোর্স): তিনিও ‘ইকবাল ভাই জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে পদত্যাগ করেছেন।মো. সোহেল ভূঁইয়া (সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, বাজিতপুর উপজেলা ছাত্রদল): বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজে ৫টি মামলাসহ পরিবারের বাবা, দাদা ও ভাইদের নামে মোট ১৯টি মামলার ঘানি টেনেছেন সোহেল ভূঁইয়া। তিনি বলেন, "জেল খাটা অবস্থায় শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল এবং উনার সুযোগ্য সন্তান শেখ রাফিদ আহমেদ সশরীরে জেলে গিয়ে আমাদের খোঁজ নিয়েছেন এবং হাইকোর্ট থেকে জামিন করানোর সময় উপস্থিত ছিলেন। দুর্দিনে তাঁদের ছেড়ে যাওয়া বেইমানি হবে। তাই সদ্য যোগদানকৃত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আমি ছাত্রদলের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলাম।"মো. তছলিম মিয়া (সভাপতি প্রার্থী ও প্রস্তাবিত সভাপতি, গাজীরচর ইউনিয়ন ছাত্রদল): দলের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এই নেতা বলেন, "যেখানে ত্যাগীদের মূল্যায়ন নেই, সেখানে থাকার অর্থ হয় না। তাই আমি আমার প্রার্থীতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম এবং ছাত্রদল থেকে পদত্যাগ করলাম।"মো. আরিফুল ইসলাম সোহাগ (সদস্য, বাজিতপুর পৌর যুবদল): নৈতিক অবস্থান ও আদর্শের প্রশ্নে পদত্যাগ করে তিনি বলেন, "যিনি ত্যাগ ও সংগ্রামে সবসময় মানুষের পাশে ছিলেন, দল তাকে অবহেলা করেছে। বর্তমানে ইকবাল ভাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জনগণের পথে হাঁটছেন, আমি উনার পাশেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"মো. নাঈম মিয়া (সদস্য সচিব, পিরিজপুর ইউনিয়ন শাখা স্বেচ্ছাসেবক দল): ২০১২ সাল থেকে দলের জন্য নিবেদিত এই কর্মী ২০১৯ সাল থেকে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি জানান, "আন্দোলন করতে গিয়ে বছরের পর বছর বাড়িছাড়া হয়েছি, তখন ইকবাল ভাই-ই আমার খোঁজ নিয়েছেন। অথচ উনাকে বাদ দিয়ে ভাড়াটে প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যা আমি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে পদত্যাগ করলাম।"মো. ফারুক আহমেদ (১নং সহ-সভাপতি, পিরিজপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল): তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বাজিতপুর-নিকলী বিএনপির ঘাঁটি হলেও দল এখানে এমন একজনকে মনোনীত করেছে যাকে গ্রামের ১০% মানুষও চেনে না। এক যুগের ভেতরেও আমাদের ইউনিয়নে যাকে দেখা যায়নি, তাকে আমরা মেনে নেব না। এ জন্য দল ব্যবস্থা নিলেও আমরা মাথা পেতে নেব।"
মাঠের পরিস্থিতি:বর্তমানে বাজিতপুর ও নিকলী এলাকায় "হাঁস" প্রতীকের পক্ষে গণজোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পদত্যাগকারী নেতারা বলছেন, তাঁরা এখন কোনো পদের লোভে নয়, বরং তাদের বিপদে পাশে থাকা নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে মাঠে কাজ করবেন।বিএনপির এই বড় অংশের পদত্যাগের ফলে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে নির্বাচনী সমীকরণ সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। তৃণমূলের এই বিশাল অংশটি এখন প্রকাশ্যেই স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছে।
২২ জানুয়ারি ২০২৬